নিউজ ডেস্ক: দেশের অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত মিললেও পুঁজিবাজারে চলছে এক অব্যাহত মন্দার ধারা। একদিকে বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা, অন্যদিকে নীতিনির্ধারকদের অনাগ্রহ—সব মিলিয়ে বাজার যেন পতনের এক গভীর গহ্বরে নিমজ্জিত।
গত ১৪ মাসে পুঁজিবাজারের সূচক বৃদ্ধির বদলে ক্রমাগত কমছে, বিনিয়োগকারীদের মুখে ফিরছে শুধুই হতাশার কথা। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে সূচক গত বুধবার (৫ নভেম্বর) নেমে আসে ৫০০০ পয়েন্টের নিচে, যা সাম্প্রতিক সময়ে সর্বনিম্ন।
বাজার বিশ্লেষকদের ভাষায়, সূচকের এই পতন যেন ‘পুঁজিবাজারের কফিনে আরেকটি পেরেক’। বিগত দিনে এক কার্যদিবস সূচক সামান্য বাড়লেও পরের তিন দিনই ঘটে পতন। এর ফলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থাহীনতা এখন চরমে পৌঁছেছে। লেনদেনের পরিমাণও দিন দিন কমছে, যা বাজারের স্থবিরতার আরেকটি সূচক। একসময় প্রতিদিন দুই হাজার কোটি টাকার লেনদেন হলেও এখন তা নেমে এসেছে ৪০০ কোটিতে।
বিনিয়োগকারীদের মতে, বাজারের বর্তমান অবস্থার জন্য দায়ী মূলত বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের দুর্বল নেতৃত্ব ও নীতিনির্ধারণে অদক্ষতা। তারা অভিযোগ করেন, কমিশন বাজারকে স্থিতিশীল করার বদলে নানা বিতর্কিত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে আরও অস্থিতিশীল করে তুলেছে। বিশেষ করে মার্জিন ঋণ সংক্রান্ত নীতিমালা পরিবর্তন, কিছু কোম্পানির তালিকাভুক্তি প্রক্রিয়া নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ এবং বাজার সংস্কারের নামে নীতির ঘন ঘন পরিবর্তন—সব মিলিয়ে বিনিয়োগকারীদের মনে তৈরি হয়েছে গভীর আস্থার সংকট।
২০২৪ সালের ১৮ আগস্ট বিএসইসির নতুন চেয়ারম্যান দায়িত্ব নেওয়ার পর অনেকের প্রত্যাশা ছিল, বাজারে নতুন করে প্রাণ ফিরবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে উল্টোটা। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে এখন পর্যন্ত ডিএসই সূচক কমেছে প্রায় ৭৯০ পয়েন্ট। এর মধ্যে গত দেড় মাসের ব্যবধানে হারিয়েছে প্রায় ৬৫০ পয়েন্ট। গত ৭ সেপ্টেম্বর ডিএসই সূচক ছিল ৫৬৩৬ পয়েন্ট, যা গত বুধবার নেমে আসে ৪৯৮৬ পয়েন্টে।
এ অবস্থায় বিনিয়োগকারীদের প্রশ্ন—কেন অন্য খাতে সংস্কার ও ইতিবাচক পরিবর্তন এলেও পুঁজিবাজারে সেই প্রভাব পড়ছে না?
অনেকেই মনে করছেন, সরকার পরিবর্তনের পর অর্থনীতিতে কিছুটা স্বস্তির হাওয়া বইলেও পুঁজিবাজার এখনও পুরনো অনিয়ম, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও স্বচ্ছতার অভাবে জর্জরিত।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, পুঁজিবাজার একটি দেশের অর্থনৈতিক শক্তিমত্তার প্রতিচ্ছবি। কিন্তু বাংলাদেশে এ খাতটি দীর্ঘদিন ধরেই সরকারের নীতিগত অগ্রাধিকারের বাইরে। অর্থ মন্ত্রণালয় বা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে বাজারকে পুনর্গঠন বা আস্থার সংকট দূর করার কোনো কার্যকর পদক্ষেপ চোখে পড়ছে না।
বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি নীতি সংস্কার, কর কাঠামোর পুনর্বিন্যাস, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়ানো এবং বিনিয়োগবান্ধব আইন প্রণয়ন ছাড়া পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়াবে না। কিন্তু বর্তমানে এসব বিষয়ে সরকারের মনোযোগ বা বাস্তব উদ্যোগের ঘাটতি প্রকট।
বাজারে টানা দরপতনের ফলে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা পড়েছেন চরম বিপাকে। অনেকেই ক্ষতির ভয়ে নতুন বিনিয়োগ থেকে বিরত থাকছেন। আবার যারা আগে বিনিয়োগ করেছেন, তারা এখন লোকসান এড়াতে শেয়ার বিক্রি করতে চাইলেও পাচ্ছেন না ক্রেতা। ফলে বাজারে তারল্য সংকট আরও প্রকট হচ্ছে। লেনদেনের পরিমাণও কমছে দ্রুত।
সূচক পতনের পাশাপাশি দৈনিক লেনদেনের ঘাটতি বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। ফলে বাজারে ‘মনস্তাত্ত্বিক চাপ’ তৈরি হচ্ছে, যা নতুন করে বিনিয়োগের প্রবণতাকে বাধাগ্রস্ত করছে।
বর্তমান কমিশন বাজার সংস্কারের নামে যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে, তার বেশির ভাগই বিনিয়োগকারীদের কাছে বিভ্রান্তিকর হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে। একদিকে হঠাৎ করেই নীতিমালা পরিবর্তন, অন্যদিকে কার্যকর পর্যবেক্ষণ ও বাজার বিশ্লেষণের অভাব—সব মিলিয়ে বাজারে তৈরি হয়েছে ‘অস্থিরতা ও অবিশ্বাসের সংস্কৃতি’।
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, সংস্কার মানে কেবল নিয়ম পরিবর্তন নয়, বরং আস্থা পুনর্গঠন এবং বিনিয়োগ পরিবেশে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। কিন্তু বর্তমান অবস্থায় কমিশনের পদক্ষেপগুলো বাজারকে স্থিতিশীল করার বদলে অস্থির করে তুলছে বলেই অভিযোগ উঠছে। বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে ধীরে ধীরে ইতিবাচক বার্তা মিললেও পুঁজিবাজার যেন সেই ছোঁয়া থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন।
বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা, সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা একসঙ্গে বসে বাজারের মৌলিক সমস্যা শনাক্ত করে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। বিশ্লেষকদের মতে, আস্থা পুনরুদ্ধারই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এজন্য দরকার—বাজারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় করা, গুজবনির্ভর লেনদেন নিয়ন্ত্রণ করা এবং কমিশনের কার্যক্রমে জবাবদিহি বাড়ানো।